নিরাপদভাবে টাকা জমাতে চাইলে বাংলাদেশের অনেক মানুষের সামনে দুটি পরিচিত বিকল্প আসে ব্যাংকের ডিপিএস এবং সরকারি সঞ্চয়পত্র। বাইরে থেকে দেখলে দুটিই প্রায় একই ধরনের মনে হতে পারে। নিয়মিত বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকা রাখা হয় এবং পরে সুদ বা মুনাফাসহ অর্থ পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্রের উদ্দেশ্য, টাকা জমার পদ্ধতি, মুনাফার হার, মেয়াদের আগে টাকা তোলার নিয়ম এবং ঝুঁকির ধরন এক নয়।
২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পার্থক্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের মুনাফার হার অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকের ডিপিএসের হার ব্যাংক, প্রকল্প ও মেয়াদ অনুযায়ী পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই শুধু কোনটির শতকরা হার বেশি সেটি দেখে সিদ্ধান্ত নিলে আপনার প্রয়োজনের সঙ্গে বিনিয়োগ মিলতে নাও পারে।
সহজভাবে বললে, হাতে আগে থেকেই একটি বড় অঙ্কের সঞ্চিত অর্থ থাকলে সঞ্চয়পত্র তুলনার একটি বিকল্প হতে পারে। অন্যদিকে মাসিক আয় থেকে ধীরে ধীরে একটি তহবিল গড়ে তুলতে চাইলে ডিপিএসের মতো কিস্তিভিত্তিক সঞ্চয় ব্যবস্থা বিবেচনা করা যায়। কোনটি উপযুক্ত হবে তা নির্ভর করে অর্থের উৎস, প্রয়োজনের সময়, মেয়াদ, প্রযোজ্য কর এবং আগাম টাকা তোলার শর্তের ওপর।
- তথ্য হালনাগাদ: এই লেখার হার, কর ও সুরক্ষাসংক্রান্ত তথ্য প্রযোজ্য সরকারি ও নিয়ন্ত্রক তথ্যের ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে। ব্যাংক বা সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পের হার ও শর্ত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ডিপিএস খোলা বা সঞ্চয়পত্র কেনার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর এবং প্রযোজ্য সরকারি নিয়মের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা উচিত। এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, ব্যক্তিগত আর্থিক বা কর পরামর্শ নয়।
ডিপিএস কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?
ডিপিএস হলো ব্যাংকের একটি নিয়মিত কিস্তিভিত্তিক সঞ্চয় ব্যবস্থা। আপনি প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দেন এবং নির্বাচিত মেয়াদ শেষে জমা অর্থের সঙ্গে প্রযোজ্য সুদ বা মুনাফা পান। কোনো কোনো ব্যাংকে ৫০০ বা ১,০০০ টাকা থেকেও মাসিক কিস্তি শুরু করা যায়। মেয়াদ তিন, পাঁচ, সাত, দশ বছর বা তারও বেশি হতে পারে। ব্যাংক ও প্রকল্পভেদে নিয়ম আলাদা হয়।
ডিপিএসের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মিত অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা। একজন চাকরিজীবী বা নিয়মিত আয়কারী ব্যক্তি মাসে ৫,০০০ বা ১০,০০০ টাকা করে জমালে কয়েক বছরে একটি সঞ্চয় তহবিল তৈরি হতে পারে। একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা জমা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে কিস্তি অনিয়মিত হলে বা মেয়াদের আগে হিসাব বন্ধ করলে প্রাপ্য সুদ বা মুনাফা ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী কমে যেতে পারে।
সঞ্চয়পত্র কী এবং কার জন্য বেশি উপযোগী?
সঞ্চয়পত্র সরকারের জাতীয় সঞ্চয় কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত একটি বিনিয়োগ ব্যবস্থা। এখানে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক একবারে বিনিয়োগ করা হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্র পরিচিত কয়েকটি ধরন। সব সঞ্চয়পত্র সবাই কিনতে পারেন না; কিছু প্রকল্পে বয়স, পেশা বা অন্য যোগ্যতার শর্ত রয়েছে।
পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিক বিনিয়োগ করতে পারেন। ব্যক্তির ক্ষেত্রে একক নামে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ এবং যুগ্ম নামে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট সঞ্চয়পত্র কেনার সীমা রয়েছে। তবে অন্যান্য সঞ্চয়পত্রের নিজস্ব সীমা ও যোগ্যতা রয়েছে। তাই কেনার আগে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বর্তমান নিয়ম যাচাই করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালে সঞ্চয়পত্রের বর্তমান মুনাফার হার
জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পূর্ণ হলে বার্ষিক মুনাফার হার ১১.৮৩ শতাংশ। এর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হার ১১.৮০ শতাংশ। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে মেয়াদান্তের হার যথাক্রমে ১১.৮২ ও ১১.৭৭ শতাংশ। পরিবার সঞ্চয়পত্রে হার ১১.৯৩ ও ১১.৮০ শতাংশ এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ হার প্রায় ১১.৯৮ শতাংশ।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। মেয়াদান্তের হার দেখেই পুরো হিসাব করা উচিত নয়। সঞ্চয়পত্র মেয়াদের আগে ভাঙালে কত বছর পূর্ণ হয়েছে তার ভিত্তিতে কম হারে মুনাফা হিসাব হতে পারে। আগে অতিরিক্ত মুনাফা দেওয়া হয়ে থাকলে সেটিও মূল টাকা থেকে সমন্বয় করা হতে পারে।
ডিপিএসের বর্তমান সুদের হার কেমন?
ডিপিএসের জন্য বাংলাদেশের সব ব্যাংকে একই সুদ বা মুনাফার হার প্রযোজ্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী জুন ২০২৬-এ তিন বছর বা তার বেশি মেয়াদের এফডিআর ও ডিপিএসের ভারিত গড় সুদের হার ছিল ৯.১৬ শতাংশ। তবে এটি সব ব্যাংকের প্রতিটি ডিপিএসের নির্দিষ্ট হার নয়; প্রকৃত হার ব্যাংক, প্রকল্প, কিস্তির পরিমাণ ও মেয়াদ অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই হিসাব খোলার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সর্বশেষ ঘোষিত হার ও শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
তাই কোনো ব্যাংকের ডিপিএস খোলার আগে শুধু বিজ্ঞাপনে দেখানো মেয়াদপূর্তির অর্থ নয়, প্রকৃত বার্ষিক হার, কিস্তি মিস করার নিয়ম, মেয়াদের আগে বন্ধ করলে কী হবে এবং কোনো সেবা খরচ আছে কি না এসব লিখিতভাবে দেখে নেওয়া ভালো।
ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্রের মূল পার্থক্য
| বিষয় | ডিপিএস | সঞ্চয়পত্র |
|---|---|---|
| টাকা জমার ধরন | মাসিক কিস্তি | সাধারণত এককালীন বিনিয়োগ |
| কার জন্য সুবিধাজনক | নিয়মিত মাসিক আয় আছে এমন ব্যক্তি | হাতে এককালীন সঞ্চিত অর্থ আছে এমন ব্যক্তি |
| হার | ব্যাংক ও প্রকল্পভেদে পরিবর্তিত | সরকার নির্ধারিত |
| মেয়াদের আগে বন্ধ | ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী কম সুদ হতে পারে | পূর্ণ হওয়া বছরের ভিত্তিতে কম মুনাফা হতে পারে |
| ঝুঁকির ধরন | ব্যাংকভিত্তিক আমানত | সরকারি সঞ্চয় প্রকল্প |
| সঞ্চয়ের অভ্যাস | নিয়মিত সঞ্চয়ের জন্য কার্যকর | আগে থেকে থাকা অর্থ সংরক্ষণের জন্য কার্যকর |
শুধু বেশি মুনাফার হার দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়
এখানেই ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্র তুলনার সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়। ধরুন, একটি সঞ্চয়পত্রের হার ১১.৮৩ শতাংশ এবং একটি ডিপিএসের হার ৯.২৫ শতাংশ। সংখ্যার হিসাবে সঞ্চয়পত্র এগিয়ে মনে হবে। কিন্তু ডিপিএসে আপনি পাঁচ বছরের সব টাকা প্রথম দিন জমা দিচ্ছেন না। প্রতি মাসে নতুন টাকা যোগ হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রে বড় অঙ্কের মূলধন শুরু থেকেই বিনিয়োগ করা থাকে। তাই দুটি হারের সরাসরি তুলনা সব সময় অর্থপূর্ণ নয়।
তুলনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অর্থটি কি এখনই আপনার হাতে রয়েছে, নাকি আগামী কয়েক বছরে নিয়মিত আয় থেকে জমবে? আগে থেকে সঞ্চিত অর্থ থাকলে সঞ্চয়পত্রের শর্তগুলো তুলনা করা যেতে পারে। আর ভবিষ্যৎ আয় থেকে ধীরে ধীরে তহবিল তৈরি করতে চাইলে ডিপিএসের কিস্তিভিত্তিক কাঠামো তুলনার জন্য বেশি প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
উৎসে করের প্রভাব কী হতে পারে?
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে সাধারণভাবে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। তবে কোনো আয়বর্ষে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে পুঞ্জীভূত বিনিয়োগ ৫ লাখ টাকা অতিক্রম না করলে ওই বিনিয়োগের মুনাফা থেকে উৎসে কর কর্তনের বিশেষ অব্যাহতি রয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ ব্যাংক আমানতের সুদ বা মুনাফায় ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণভাবে উৎসে কর প্রযোজ্য হলেও সরকার অথবা সরকারের পূর্বানুমোদিত তফসিলি ব্যাংকের নির্দিষ্ট ডিপোজিট পেনশন স্কিমের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তাই নির্দিষ্ট ডিপিএসের করব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও প্রচলিত আয়কর বিধান থেকে নিশ্চিত করা উচিত।
উদাহরণ হিসেবে, ১১.৮৩ শতাংশ ঘোষিত মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হলে শুধু ওই কর্তনের পরিমাণ বিবেচনায় নগদে পাওয়া মুনাফা মূলধনের প্রায় ১০.৬৫ শতাংশের সমতুল্য হতে পারে। তবে উৎসে কর্তিত করকে সরাসরি চূড়ান্ত করের বোঝা ধরে নেওয়া ঠিক নয়; ব্যক্তির আয়কর পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী হিসাব ভিন্ন হতে পারে।
মূল্যস্ফীতিও বিবেচনায় রাখা জরুরি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী জুলাই ২০২৬-এ জাতীয় পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩২ শতাংশ। অর্থাৎ সঞ্চয়ের আসল লক্ষ্য শুধু টাকার অঙ্ক বাড়ানো নয়, টাকার ক্রয়ক্ষমতাও যতটা সম্ভব ধরে রাখা। কোনো সঞ্চয় থেকে ৯ শতাংশ পাওয়া গেলেও মূল্যস্ফীতি কাছাকাছি থাকলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার বৃদ্ধি খুব বেশি নাও হতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তে ঘোষিত মুনাফা, কর এবং মূল্যস্ফীতি তিনটিই বিবেচনায় নেওয়া ভালো।
ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্রের সুরক্ষা কাঠামো কীভাবে আলাদা?
সঞ্চয়পত্র সরকারি জাতীয় সঞ্চয় কর্মসূচির অংশ, আর ডিপিএস সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে রাখা আমানত। ২০২৬ সালের আমানত সুরক্ষা আইন অনুযায়ী প্রতি আমানতকারী, প্রতি প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সুরক্ষার সীমা নির্ধারিত রয়েছে। তাই ডিপিএসের ক্ষেত্রে সুদ বা মুনাফার হারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শর্ত এবং প্রচলিত আমানত সুরক্ষা কাঠামো সম্পর্কেও জানা প্রয়োজন।
কাদের জন্য ডিপিএস ভালো হতে পারে?
মাসিক বেতন বা নিয়মিত আয় থেকে নির্দিষ্ট অর্থ আলাদা করতে চান, কিন্তু বর্তমানে বড় অঙ্কের সঞ্চয় নেই এমন ব্যক্তির জন্য ডিপিএস কার্যকর হতে পারে। সন্তানের শিক্ষা, ভবিষ্যৎ বাড়ির প্রাথমিক অর্থ, অবসর-পূর্ব সঞ্চয় বা পাঁচ থেকে দশ বছর পরের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলে মাসিক কিস্তি সেই লক্ষ্যকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখে।
কাদের জন্য সঞ্চয়পত্র ভালো হতে পারে?
যাদের হাতে ইতিমধ্যে কয়েক লাখ টাকা সঞ্চিত আছে এবং অর্থটি স্বল্প সময়ে প্রয়োজন হবে না, তাদের জন্য সঞ্চয়পত্র বেশি প্রাসঙ্গিক হতে পারে। বিশেষ করে অবসরকালীন অর্থ, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় বা এমন অর্থ যা পাঁচ বছরের মতো সময় নিরাপদভাবে রাখা সম্ভব সেখানে সরকারি সঞ্চয় প্রকল্প বিবেচনা করা যায়। অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সঞ্চয়পত্র কেনার যোগ্যতা ও সীমা আগে পরীক্ষা করতে হবে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ৫টি বিষয় যাচাই করুন
সিদ্ধান্তের আগে পাঁচটি বিষয় যাচাই করা যায়: বর্তমানে হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ, নিয়মিত সঞ্চয়ের সামর্থ্য, জরুরি প্রয়োজনে অর্থের প্রয়োজন হতে পারে কি না, কর কর্তনের পর সম্ভাব্য প্রাপ্তি এবং মেয়াদের আগে অর্থ তুললে কী নিয়ম প্রযোজ্য হবে। ডিপিএসের ক্ষেত্রে কিস্তি মিস ও আগাম হিসাব বন্ধের শর্ত এবং সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে বছরভিত্তিক আগাম নগদায়নের হার আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
১. ডিপিএস নাকি সঞ্চয়পত্রে মুনাফা বেশি?
বর্তমান ঘোষিত হার বিবেচনায় অনেক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার সাধারণ ব্যাংক ডিপিএসের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে এটি সরাসরি তুলনা নয়। সঞ্চয়পত্রে সাধারণত এককালীন টাকা প্রথম দিন থেকেই বিনিয়োগ থাকে, আর ডিপিএসে মাসে মাসে টাকা জমে। তাই নিজের নগদ প্রবাহ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
২. মাসে ৫,০০০ টাকা সঞ্চয় করতে চাইলে কোনটি ভালো?
আপনার কাছে এখন বড় অঙ্কের অর্থ না থাকলে এবং মাসে ৫,০০০ টাকা করে সঞ্চয় করতে চাইলে ডিপিএসের মতো মাসিক কিস্তিভিত্তিক ব্যবস্থা তুলনার জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। এতে নির্দিষ্ট সময় পরপর অর্থ জমা দেওয়া যায় এবং কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে একটি সঞ্চয় তহবিল তৈরি করা সম্ভব।
৩. হাতে ৫ লাখ টাকা থাকলে কী বিবেচনা করা উচিত?
প্রথমে দেখুন আগামী কয়েক বছরে টাকাটির প্রয়োজন হবে কি না। জরুরি অর্থ আলাদা থাকার পরও যদি পুরো ৫ লাখ টাকা দীর্ঘ সময় রাখা সম্ভব হয়, সঞ্চয়পত্রের বর্তমান হার, যোগ্যতা ও আগাম নগদায়নের নিয়ম পরীক্ষা করতে পারেন।
৪. সঞ্চয়পত্র কি মেয়াদের আগে ভাঙানো যায়?
হ্যাঁ, নির্ধারিত নিয়মে মেয়াদের আগেও নগদায়ন করা যায়। তবে পূর্ণ মেয়াদের ঘোষিত মুনাফা পাওয়া যায় না। কত বছর সম্পন্ন হয়েছে তার ভিত্তিতে প্রযোজ্য হার নির্ধারণ হতে পারে এবং আগে বেশি অর্থ দেওয়া হয়ে থাকলে সেটি সমন্বয় করা হতে পারে।
৫. ডিপিএস মাঝপথে বন্ধ করলে কী হয়?
ডিপিএস মাঝপথে বন্ধ করার নিয়ম ব্যাংক ও প্রকল্পভেদে আলাদা। মেয়াদপূর্তির আগে হিসাব বন্ধ করলে ঘোষিত পূর্ণ-মেয়াদি সুদ বা মুনাফার পরিবর্তে কম হার প্রযোজ্য হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য শর্তও থাকতে পারে। তাই ডিপিএস খোলার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আগাম হিসাব বন্ধের নিয়ম লিখিতভাবে দেখে নেওয়া উচিত।
৬. ডিপিএসের সব টাকা কি আমানত সুরক্ষার আওতায় থাকে?
২০২৬ সালের আইনে প্রতি আমানতকারী, প্রতি সদস্য প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষিত আমানতের সীমা রয়েছে। কারও মোট আমানত এর বেশি হলে পুরো অর্থকে ওই নির্দিষ্ট সুরক্ষা সীমার মধ্যে ধরে নেওয়া যাবে না।
৭. ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্রে কর দিতে হয় কি?
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে সাধারণভাবে উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বিশেষ বিধান রয়েছে। ব্যাংকের সাধারণ আমানতের সুদ বা মুনাফাতেও উৎসে করের নিয়ম রয়েছে, তবে অনুমোদিত নির্দিষ্ট ডিপোজিট পেনশন স্কিমের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হতে পারে। ব্যক্তির চূড়ান্ত কর দায় তার আয় ও প্রযোজ্য আয়কর বিধানের ওপর নির্ভর করে।
৮. অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য কোনটি বেশি কার্যকর?
এটি তার প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে। অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির হাতে যদি এককালীন অর্থ থাকে এবং নিয়মিত মুনাফা প্রয়োজন হয়, যোগ্য হলে পেনশনার বা অন্য উপযুক্ত সঞ্চয়পত্র বিবেচনা করা যেতে পারে। অন্যদিকে নিয়মিতভাবে নতুন সঞ্চয় করার আয় থাকলে ডিপিএসও কাজে আসতে পারে।
৯. একই সঙ্গে ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্র রাখা যায় কি?
যোগ্যতা, বিনিয়োগসীমা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শর্ত মেনে ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্র দুটিই রাখা সম্ভব। দুটি ব্যবস্থার উদ্দেশ্য আলাদা হওয়ায় কেউ চাইলে আগে থেকে থাকা সঞ্চিত অর্থ এবং ভবিষ্যৎ মাসিক সঞ্চয়কে পৃথকভাবে পরিকল্পনা করতে পারেন। তবে কোন খাতে কত অর্থ রাখা হবে তা ব্যক্তির প্রয়োজন ও আর্থিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
১০. সিদ্ধান্ত নেওয়ার সবচেয়ে সহজ নিয়ম কী?
সহজভাবে তুলনা করতে প্রথমে দেখুন, যে অর্থ সঞ্চয় করতে চান সেটি কি ইতিমধ্যে হাতে আছে, নাকি ভবিষ্যতের মাসিক আয় থেকে আসবে। আগে থেকে থাকা অর্থের ক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্রের শর্ত এবং নিয়মিত ভবিষ্যৎ আয়ের ক্ষেত্রে ডিপিএসের শর্ত তুলনা করা যেতে পারে। এরপর মুনাফা বা সুদের হার, কর, মেয়াদ, কিস্তি এবং আগাম অর্থ তোলার নিয়ম মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
উপসংহার
ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্রের মধ্যে সবার জন্য একই বিকল্প উপযুক্ত নয়। ডিপিএস মূলত নিয়মিত আয় থেকে ধাপে ধাপে সঞ্চয় তৈরির ব্যবস্থা, আর সঞ্চয়পত্র আগে থেকে থাকা অর্থ নির্দিষ্ট মেয়াদে রাখার একটি সরকারি সঞ্চয় মাধ্যম। বর্তমানে পূর্ণ মেয়াদের কিছু সঞ্চয়পত্রের ঘোষিত মুনাফার হার অনেক ব্যাংক ডিপিএসের হারের তুলনায় বেশি হতে পারে, তবে শুধু ঘোষিত হার দিয়ে দুটি ব্যবস্থার সরাসরি তুলনা যথেষ্ট নয়। অর্থ কখন প্রয়োজন হবে, করের নিয়ম, মেয়াদ এবং আগাম উত্তোলনের শর্ত মিলিয়ে দেখলেই তুলনাটি বেশি বাস্তবসম্মত হবে।