বর্তমান বিশ্বের অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো ইন্টারনেট। প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর আবিষ্কার শুধু যোগাযোগের মাধ্যমকেই সহজ করেনি, বরং শিক্ষাব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদনসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যেভাবে ইন্টারনেট নির্ভর হয়ে পড়েছি, ঠিক তেমনিভাবে এক সময় মানুষ ইন্টারনেট শব্দটির সাথেই পরিচিত ছিল না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধাপে ধাপে ইন্টারনেট চালু হয়েছে এবং বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। এই লেখায় আমরা জানব, বিশ্বের প্রথম কোথায় এবং কবে ইন্টারনেট চালু হয়, এবং বাংলাদেশে কবে থেকে ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
বাংলাদেশে কবে ইন্টারনেট চালু হয়
বাংলাদেশে ইন্টারনেটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৬ সালের ৪ জুন। ওই দিন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (BTCL), তৎকালীন বিটিটিবি (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস বোর্ড), প্রথমবারের মতো জনগণের জন্য dial-up ভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা চালু করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্লোবাল ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়। তবে এর আগে ১৯৯৩ সাল থেকেই কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে ইমেইল ও ডেটা ট্রান্সফার সেবা প্রদান করছিল, যদিও তা পূর্ণাঙ্গ ইন্টারনেট সেবা ছিল না। ইন্টারনেটের প্রথম দিকে গতি ছিল খুবই ধীর এবং ব্যবহার সীমিত ছিল মূলত বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কিছু কর্পোরেট দপ্তরে। ধীরে ধীরে দেশের আইটি খাতের বিকাশ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে ইন্টারনেটের প্রসার বাড়তে থাকে, আর আজ বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে।
বিশ্বে ইন্টারনেট চালু হয় কবে
ইন্টারনেটের সূচনা হয় মূলত ১৯৬০-এর দশকে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স ডিপার্টমেন্ট একটি প্রকল্প হাতে নেয়, যার নাম ছিল ARPANET (Advanced Research Projects Agency Network)। এটি ছিল একধরনের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, যা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সহজ করতে তৈরি করা হয়। ১৯৬৯ সালে ARPANET-এর মাধ্যমে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার যুক্ত হয়, এবং এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম কার্যকর ইন্টারনেট প্রোটোটাইপ। সেই সময় এটি শুধুমাত্র সামরিক ও গবেষণামূলক কাজে সীমাবদ্ধ ছিল।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। ১৯৮৩ সালে TCP/IP (Transmission Control Protocol/Internet Protocol) প্রোটোকল চালু হয়, যা আজকের ইন্টারনেটের ভিত্তি। এরপর ধীরে ধীরে ARPANET বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং TCP/IP ভিত্তিক নতুন নেটওয়ার্ক গঠিত হয়। ১৯৯১ সালে বিশ্ববাসীর জন্য ইন্টারনেট উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, যখন প্রথম ওয়েব ব্রাউজার (WorldWideWeb) তৈরি করেন টিম বার্নার্স-লি। এটি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের একটি নতুন যুগের সূচনা।
ইন্টারনেট বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে, যখন ব্যক্তিগত কম্পিউটার, ই-মেইল, ওয়েবসাইট এবং অনলাইন সার্ভিসগুলো জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ১৯৯5 সাল থেকে ইন্টারনেট বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে এবং বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা শুরু করে। এরপর মোবাইল ইন্টারনেট, ওয়াই-ফাই, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ক্লাউড প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেট ছাড়া আধুনিক জীবন কল্পনা করা কঠিন।
ইন্টারনেট কে আবিষ্কার করেন কত সালে
ইন্টারনেট কোনও একজন ব্যক্তির একক আবিষ্কার নয় — এটি একাধিক বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর যৌথ প্রচেষ্টার ফল। তবে ইন্টারনেটের মূল ভিত্তি গঠনে যাঁদের অবদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ভিন্টন সার্ফ (Vinton Cerf) ও বব কান (Bob Kahn)। এই দুই মার্কিন প্রকৌশলী ১৯৭৩ সালে TCP/IP (Transmission Control Protocol / Internet Protocol) নামক একটি কমিউনিকেশন প্রোটোকল তৈরি করেন, যা বর্তমান ইন্টারনেটের প্রযুক্তিগত ভিত্তি।
এই TCP/IP প্রযুক্তি ১৯৮৩ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় এবং সেদিনকেই অনেকে “ইন্টারনেটের জন্মদিন” হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। যদিও ১৯৬৯ সালে ARPANET-এর মাধ্যমে প্রথম নেটওয়ার্ক সংযোগ স্থাপন করা হয়েছিল, তবে TCP/IP চালুর মাধ্যমে ইন্টারনেট আধুনিক রূপ পায় এবং ধীরে ধীরে তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
সারসংক্ষেপ:
- মূল প্রোটোকল নির্মাতা: ভিন্টন সার্ফ ও বব কান
- TCP/IP তৈরি: ১৯৭৩ সাল
- ইন্টারনেট চালুর আনুষ্ঠানিক বছর: ১৯৮৩
ইন্টারনেট বর্তমানে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সাহায্যে বিশ্ব এখন একটি “গ্লোবাল ভিলেজ”-এ রূপ নিয়েছে, যেখানে তথ্য, যোগাযোগ ও সেবা পেতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। বিশ্বে ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু হয়েছিল গবেষণা ও সামরিক প্রয়োজনে, কিন্তু ধীরে ধীরে তা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়।
বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি এসেছে কিছুটা পরে, ১৯৯৬ সালে, তবে অল্প সময়েই দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। শিক্ষা, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই ইন্টারনেট নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। তাই বলা যায়, ইন্টারনেট শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমাজ গঠনের একটি প্রধান চালিকা শক্তি।