বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ( MFS) বা মোবাইল ব্যাংকিং আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। কেনাকাটা, বিল পরিশোধ থেকে শুরু করে মুহূর্তের মধ্যে টাকা পাঠানো- সবই এখন হাতের মুঠোয়। তবে এই জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে একদল অসাধু চক্র বা প্রতারক সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা, হাতিয়ে নিচ্চে। বিকাশ বা নগদে প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে বাচতে হলে আপনাকে কিচু বিশেষ কৌশল ও সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।
১. পিন ( PIN) এবং ওটিপি ( OTP) এর গোপনীয়তা রক্ষা
বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্টের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো আপনার ৪ বা ৫ ডিজিটের গোপন পিন নম্বর। প্রতারকরা প্রায়ই নিজেকে বিকাশ বা নগদের হেড অফিসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ফোন করে এবং আপনার অ্যাকাউন্টে কোনো সমস্যা হয়েছে বলে জানায়। এরপর তারা আপনার পিন নম্বর বা মোবাইলে আসা ৬ ডিজিটের ওটিপি (OTP) কোডটি জানতে চায়।
সতর্কতা: মনে রাখবেন, বিকাশ বা নগদের কোনো প্রতিনিধি কখনোই আপনার কাছে ফোন করে পিন বা ওটিপি জানতে চাইবে না। এই কোডটি শেয়ার করা মানেই আপনার অ্যাকাউন্টের চাবি অন্যের হাতে তুলে দেওয়া।
২. ভুল করে টাকা আসার ফাঁদ চিনুন
এটি বর্তমানে সবচেয়ে সাধারণ প্রতারণা। প্রতারক আপনাকে ফোন করে বলবে, “ভাই, ভুল করে আপনার নম্বরে ৫,০০০ টাকা চলে গেছে, দয়া করে টাকাটা ফেরত দিন।” এরপর তারা হুবহু বিকাশ বা নগদের মেসেজের মতো একটি ভুয়া মেসেজ আপনার ফোনে পাঠাবে। আপনি মেসেজ দেখে বিশ্বাস করে নিজের পকেট থেকে টাকা পাঠিয়ে দিলেই প্রতারণার শিকার হবেন।
করণীয়: কারো কথায় বিশ্বাস করে টাকা ফেরত দেওয়ার আগে অবশ্যই নিজের অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স চেক করুন। অ্যাপ বা ইউএসএসডি কোড (*২৪৭# বা *১৬৭#) ডায়াল করে নিশ্চিত হোন যে সত্যিই টাকা এসেছে কি না। ব্যালেন্স না বাড়লে বুঝবেন সেটি একটি ভুয়া মেসেজ ছিল।
৩. লটারি বা পুরস্কারের লোভ থেকে দুরে থাকুন
অনেক সময় ফোন করে বলা হয়, “আপনি লটারি জিতেছেন” অথবা “সরকার থেকে আপনাকে অনুদান দেওয়া হচ্ছে।” এই টাকা পাওয়ার জন্য তারা আপনাকে নির্দিষ্ট কিছু নম্বর ডায়াল করতে বলে অথবা আপনার ফোনে একটি কোড পাঠাতে চায়। অনেক সময় তারা বলে, পুরস্কারের টাকা পেতে হলে আগে কিছু ‘ভ্যাট’ বা ‘সার্ভিস চার্জ’ পাঠাতে হবে।
সতর্কতা: লটারি বা পুরস্কারের টাকা পাওয়ার জন্য কখনোই কাউকে আগে টাকা পাঠাতে হয় না। এই ধরনের প্রলোভন দেখামাত্রই কলটি কেটে দিন।
৪. অপরিচিত লিঙ্কে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন
ফেসবুক, মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে প্রায়ই বিভিন্ন আকর্ষণীয় অফারের লিঙ্ক আসে। যেমন: “বিকাশে ৫,০০০ টাকা বোনাস পেতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন।” এই লিঙ্কগুলোতে ক্লিক করলে আপনার ফোনের নিয়ন্ত্রণ প্রতারকদের হাতে চলে যেতে পারে অথবা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হতে পারে। তাই অপরিচিত কোনো সোর্স থেকে আসা লিঙ্কে ক্লিক করবেন না।
৫. সেন্ড মানি বা পেমেন্টের আগে যাচাই করুন
অনলাইনে কেনাকাটা করার সময় অনেক সময় ফেসবুক পেজগুলো অগ্রিম টাকা দাবি করে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা পাওয়ার পর তারা আপনাকে ব্লক করে দেয়। তাই অপরিচিত বা নতুন কোনো পেজ থেকে পণ্য কেনার সময় সবসময় ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ (পণ্য হাতে পেয়ে টাকা পরিশোধ) পদ্ধতি বেছে নিন।
৬. অ্যাপের নিরাপত্তা এবং বায়োমেট্রিক ব্যবহার
সবসময় অফিশিয়াল বিকাশ বা নগদ অ্যাপ ব্যবহার করুন। অ্যাপে ঢোকার জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ফেস আইডি লক ব্যবহার করা পিন ব্যবহারের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ। এতে করে আপনার পাশে থাকা কেউ আপনার পিন নম্বরটি দেখে ফেলার সুযোগ পাবে না।
৭. প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত যা করবেন
যদি দুর্ভাগ্যবশত আপনি প্রতারণার শিকার হন বা আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার সন্দেহ হয়, তবে সাথে সাথে নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:
দ্রুত বিকাশ (১৬২৪৭) বা নগদের (১৬১৬৭) হেল্পলাইনে কল করে আপনার অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিন।নিকটস্থ থানায় গিয়ে একটি জিডি (General Diary) করুন।প্রতারক যে নম্বর থেকে ফোন দিয়েছিল, সেই নম্বরটি কর্তৃপক্ষকে জানান।
ডিজিটাল লেনদেনে প্রযুক্তির চেয়ে আপনার সচেতনতা বেশি কার্যকর। কোনো অজানা কলে আতঙ্কিত বা প্রলুব্ধ না হয়ে সর্বদা ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিন। আপনার পিন এবং ওটিপি কারো সাথে শেয়ার না করলে আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা প্রায় অসম্ভব। সচেতন থাকুন এবং আপনার কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে রাখুন।