বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য বৈধ পাসপোর্ট থাকা আবশ্যক। আগে পাসপোর্ট করতে হলে ভোটার আইডি কার্ড প্রধান পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ দিয়েও পাসপোর্ট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে যারা এখনো জাতীয় পরিচয়পত্র পাননি, যেমন ১৮ বছরের নিচের শিক্ষার্থী বা শিশুদের জন্য জন্ম নিবন্ধন একটি কার্যকর পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করছে।
২০২৫ সালের হালনাগাদ নিয়ম অনুযায়ী, জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট করতে হলে কিছু নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করতে হয়। এই প্রক্রিয়া সহজ হলেও সঠিক তথ্য জানা না থাকলে অনেকেই ভোগান্তিতে পড়েন। তাই এখানে জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট করার নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি এবং গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট করার যোগ্যতা
জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করে পাসপোর্ট করতে হলে কিছু যোগ্যতা পূরণ করতে হবে।
-
আবেদনকারীর বৈধ জন্ম নিবন্ধন সনদ থাকতে হবে।
-
জন্ম নিবন্ধন অবশ্যই অনলাইন যাচাইকৃত (Online Verified) হতে হবে।
-
শিশুর বয়স ০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে হলে জন্ম নিবন্ধন দিয়েই পাসপোর্ট তৈরি হবে।
-
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধনের পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্রও লাগতে পারে, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন দিয়েও পাসপোর্টের আবেদন করা যাবে।
-
আবেদনকারীর নাম, জন্মতারিখ এবং পিতামাতার তথ্য জন্ম নিবন্ধন ও অন্যান্য নথির সাথে সঠিকভাবে মিলে যেতে হবে।
জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট আবেদন করার সময় নিম্নলিখিত কাগজপত্র জমা দিতে হবে –
-
অনলাইনে যাচাইকৃত জন্ম নিবন্ধন সনদ (Birth Certificate)।
-
আবেদনকারীর ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে তোলা)।
-
পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি।
-
বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে স্কুল আইডি কার্ড বা সনদপত্র।
-
পিতা-মাতার পাসপোর্ট থাকলে তার কপি।
-
অনলাইন থেকে পূরণকৃত পাসপোর্ট আবেদন ফর্ম।
-
নির্ধারিত ফি জমার রসিদ।
জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট করার ধাপসমূহ
জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট করার প্রক্রিয়া মোটামুটি সহজ এবং অনলাইনে শুরু করা যায়।
১. অনলাইন আবেদন ফর্ম পূরণ
প্রথমে www.passport.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে নতুন আবেদনকারী হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এরপর জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিয়ে তথ্য এন্ট্রি করে আবেদন ফর্ম পূরণ করতে হবে।
২. ফি পরিশোধ
পাসপোর্টের ধরণ অনুযায়ী ফি পরিশোধ করতে হবে। সাধারণত –
-
৫ বছরের মেয়াদী সাধারণ (48 পৃষ্ঠা): ৪,০২৫ টাকা
-
৫ বছরের মেয়াদী জরুরি (48 পৃষ্ঠা): ৬,৯০০ টাকা
-
১০ বছরের মেয়াদী সাধারণ (48 পৃষ্ঠা): ৫,৭৫০ টাকা
-
১০ বছরের মেয়াদী জরুরি (48 পৃষ্ঠা): ৯,২০০ টাকা
ফি সোনালী ব্যাংক বা নির্ধারিত অন্য ব্যাংকে জমা দিতে হবে।
৩. আবেদনপত্র জমা
ফি জমার রসিদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিসে আবেদনপত্র জমা দিতে হবে।
৪. বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলা
আবেদনকারীকে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও ছবি) সম্পন্ন করতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
৫. তথ্য যাচাই ও অনুমোদন
পাসপোর্ট অফিস কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীর জন্ম নিবন্ধন ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করবে। সব তথ্য সঠিক থাকলে অনুমোদন দেওয়া হবে।
৬. পাসপোর্ট সংগ্রহ
আবেদন অনুমোদনের পর নির্ধারিত সময়ে (সাধারণে ১৫-২০ কর্মদিবস, জরুরিতে ৭-১০ কর্মদিবস) পাসপোর্ট সংগ্রহ করা যাবে।
জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে সাধারণ সমস্যা ও সমাধান
অনেক সময় জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট করার সময় কিছু জটিলতা দেখা দেয়। যেমন –
-
জন্ম নিবন্ধনে নামের বানান ভুল।
-
জন্ম তারিখে অসঙ্গতি।
-
পিতামাতার নাম বা তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে না মেলা।
সমাধান:
এসব ক্ষেত্রে প্রথমেই জন্ম নিবন্ধনের তথ্য অনলাইনে সংশোধন করতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশনে যোগাযোগ করা উচিত।
সতর্কতা ও নির্দেশনা
-
জন্ম নিবন্ধন অবশ্যই অনলাইনে যাচাইকৃত হতে হবে, হাতে লেখা বা পুরনো কপি গ্রহণযোগ্য নয়।
-
তথ্যের বানান, জন্মতারিখ, পিতামাতার নাম–সবকিছুতে মিল থাকতে হবে।
-
পাসপোর্ট আবেদনে কোনো ভুল তথ্য দিলে তা বাতিল হতে পারে বা আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
-
আবেদনপত্র জমা দেওয়ার আগে সব কাগজপত্র ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।
২০২৫ সালে জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করা এখন অনেক সহজ হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়াই জন্ম নিবন্ধন সনদ দিয়ে পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব। তবে শর্ত হলো জন্ম নিবন্ধনটি অবশ্যই অনলাইনে যাচাইকৃত হতে হবে এবং সব তথ্য সঠিক থাকতে হবে। নিয়ম মেনে আবেদন করলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নতুন পাসপোর্ট হাতে পাওয়া যায়।